সৈকত টুরিস্ট পুলিশ কোথায়?

image_83366_0কক্সবাজার থেকে ফিরে: কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গিয়ে আপনি যদি কোনো কারণে টুরিস্ট পুলিশ খুঁজতে যান তবে অমাবশ্যার রাতে জ্যোস্না খোঁজার মতোই আপনার অবস্থা হবে।আর যদি আপনি মনে করেন, সৈকতে টুরিস্ট পুলিশ আপনাকে নিরাপত্তা দেবে, তবে ধরেই নিতে হবে আপনি এখনও বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন।কারণ সৈকতে প্রতিদিন ৫০ হাজার পর্যটকের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আছেন ট্যুরিস্ট পুলিশের মাত্র ৪০ সদস্য। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ জনকে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির কাজে সব সময় ব্যস্ত রাখা হয়। বাকিদের কেউ ছুটিতে কেউ অসুস্থতার কথা বলে অনুপস্থিত থাকেন। এ তথ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে।  ফলে কাগজে কলমে ৪০ জন থাকলেও বাস্তবে সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় কোনো ট্যুরিস্ট পুলিশ নেই। কলাতলী, সুগন্ধা, সি-বিচ, লাবণী, ইনানী বিচসহ সব পয়েন্টে পর্যটকরা থাকেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়।ট্যুরিস্ট পুলিশ না থাকায় লাবনী বিচের পাশের ঝাউবনে প্রায় সময়ই ছিনতাই, প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এসব কারণে অনেক পর্যটক উল্লেখযোগ্য স্পটে ভয়ে যেতে চান না। কাছাকাছি নিরাপদ স্পটগুলোতে গিয়ে আবার ফিরে আসেন। ফলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা প্রায় নেই বলেই জানা গেছে।পর্যটক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিদেশি পর্যটক না এলে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদানই রাখতে পারবে না। বিদেশি পর্যটক টানতে তাদের নিরাপত্তা ও সৈকত এলাকায় সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।জানা গেছে, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তায় ২০১৩ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ট্যুরিস্ট পুলিশ গঠনে ৬২১টি পদ সৃষ্টি করা হয়। এরপর ট্যুরিস্ট পুলিশের ডিআইজি, এসপিসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা পুলিশ সদর দপ্তরে বসে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশের কোনো কর্মতৎপরতা দেখা যায়নি।কক্সবাজারে লাবনী পয়েন্টে ট্যুরিস্ট পুলিশের একটি ভবন তৈরি করা হয়েছে। ২০০৮ সালের ৮ মার্চ পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদ ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেখানে ৮২ জন ট্যুরিস্ট পুলিশ সদস্য থাকার কথা। কিন্তু পর্যটন মৌসুমেও সেখানে কোনো ট্যুরিস্ট পুলিশ নেই। নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা।সরজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিবছর দেশের হাজার হাজার পর্যটক কক্সবাজার সৈকতে বেড়াতে আসেন। সকাল ৬টা থেকে শুরু করে গভীররাত পর্যস্ত কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ঘোরাফেরা করেন। এসব পর্যটক বিমান ও বাসে কক্সবাজার গেলেও সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় তারা পদে পদে হয়রানির শিকার হন। নির্দিষ্ট স্থান খুঁজে পেতে পথচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয়। তাদের অনেকের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যটকরা ভুল পথে গিয়ে বিপদে পড়েন বলেও জানা গেছে।সরজমিনে দেখা গেছে, সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের বিশ্রাম নিয়ে চলছে চাঁদাবাজি। সৈকতে রাখা চেয়ারে এক ঘণ্টা বসলে ৩০ টাকা থেকে শুরু করে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন চাঁদাবাজরা। টাকা না দিলে তাদের হাতে অপমানিত হতে হয় পর্যটকদের।এভাবে সমুদ্রের আশপাশে বহু চেয়ার-টেবিল ও বেঞ্চ পেতে পর্যটকদের কাছ থেকে প্রতিদিন বিপুল অর্থ আদায় করে নিচ্ছে স্থানীয় কিছু অসাধু চক্র। প্রতি ১০টি চেয়ারের মালিক একজন। দিনে আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা আয় হয় তাদের। টাকা না দিলে বসা যাবে না। সেখানে মাঝে মধ্যে শিশুরা নিজেদের অজান্তে বসতে গেলে নাজেহাল হতে হয় তার পরিবারের সদস্যদের। এভাবে সমুদ্র সৈকতের বিভিন্ন স্পটে প্রায় সময় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। কিন্তু পাশে পাওয়া যায় না জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যুরিস্ট পুলিশ সদস্যদের। অনেকেই ঝামেলা এড়াতে নীরবে কষ্ট সহ্য করেন।কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভার-প্রাপ্ত কর্মকর্তা জাকির হোসাইন মাহমুদ বাংলামেইলকে বলেন, ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ থাকার কথা ৮২ জন, সেখানে রয়েছে ৪০ জন। এর মধ্যে ট্রাফিক, রাজনৈতিক সভা সমাবেশ ও রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য দেয়া হয়। এসব কারণে পর্যটন এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সংখ্যা খুবই নগণ্য।’তিনি আরো বলেন, ‘প্রতি শুক্রবার সমুদ্র সৈকতে প্রায় ৫০ হাজার পর্যটক উপস্থিত হন। বিশেষ করে জাতীয় দিনগুলোতে পর্যটকদের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। তারপরেও সীমিত সংখ্যক ট্যুরিস্ট পুলিশ দিয়ে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে এখানে একবার কেউ এলে দ্বিতীয়বার আর আসতে চায় না। বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যাও দিন দিন শূন্যের কোটায় নেমে আসছে।’বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা না গেলে জাতীয়ভাবে অর্থনীতির উন্নয়নে সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার কোনো অবদান রাখতে পারবে না বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা।তিনি জানান, পর্যটকদের সুবিধার্থে ০১৮৪১-৬৬৬৬৬৪, ০১৯৭১-৭২৬৬৬৬, ০১৭২৭-৬৬৬৬৬৬, ০১৭১৩-৩৭৪৭২৪ নম্বরে হেল্প লাইন চালু করেছি। যে কোনো পর্যটক সমস্যার কথা এই মোবাইল নম্বরে জানালে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।এদিকে কক্সবাজারের হিমছড়ি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের কাছে অটোরিকশা বা টম টম একটু থামতে আগে টাকা না লাগলেও এখন টাকা দিতে হয়। গাড়ি থামতে না থামতে টাকার জন্য রশিদ কেটে দেয়া হয়। ওই রশিদে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের নাম উল্লেখ রয়েছে। সেখানে হিমছড়ি পাহাড়ের ঝরণা দেখা ও পাহাড়ে উঠতে ২৩ টাকা টিকিট লাগে। টিকিট কেটে ঢোকা কষ্টকর। অনেকেই টিকিট নিয়ে প্রায় সময় হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ট্যুরিস্ট পুলিশ সদস্য নেই। স্থানীয় প্রভাবশালীরা পর্যটকদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো টাকা আদায় করছেন।এভাবে হিমছড়ি পর্যটন স্পটেও পর্যটকদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এছাড়া ইনানী বিচসহ বিভিন্ন পয়েন্টে কোনো ট্যুরিস্ট পুলিশ দেখা যায় না। পর্যটকরা নিজেদের মতো নানাভাবে ঘোরাফেরা করে চলে যায়।এ সম্পর্কে কক্সবাজার জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এখনও কিছু কিছু স্থানে জেলা পুলিশ সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। তারা কোনো পর্যটকের বিপদে পড়ার খবর পেয়েই ওই স্থানে ছুটে যান। তবে এখনও ট্যুরিস্ট পুলিশ তাদের পুরো কার্যক্রম শুরু করতে না পারায় এসব ঘটনা থেকে উত্তরণে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’এ ব্যাপারে ট্যুরিস্ট পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ পুরোপুরি নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু করতে আরও ২ মাস সময় লাগতে পারে। মাঠপর্যায়ে অবকাঠামোসহ নানা প্রস্তুতি চলছে।’বেসরকারি বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘অভ্যন্তরীণ পর্যটক বাড়লেও আশানুরূপ বাড়েনি বিদেশি পর্যটক।’তিনি বলেন, ‘আগামী বছরকে পর্যটন বছর হিসেবে ঘোষণার জন্য ইতিমধ্যেই একটি প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।’মন্ত্রী বলেন, ‘কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ শাখা-৩ এক আদেশে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয় চিন্তা করে ট্যুরিস্ট পুলিশ ইউনিট গঠনের জন্য ৬২১টি পদ সৃষ্টি করে। এরমধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, এসপি, এএসপিসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা ও সদস্য রয়েছে। এছাড়া ৮০টি যানবাহনসহ অন্য জিনিসপত্র কেনাকাটার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কিন্তু অনুমোদনের পরও তা বাস্তবায়নে গড়িমশি চলছে। ফলে যে আশা নিয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশ গঠিত হয়েছে তার ফল পাচ্ছেন না পর্যটকরা।এর ফলে বাংলাদেশের গর্ব পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারছে না।

Categories: চট্টগ্রাম,সারা দেশ