দেবো খোঁপায় তারার ফুল

এমডি আবু জাফর, বিশেষ প্রতিনিধিঃঃ ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, দেবো খোঁপায় তারার ফুল।’ জাতীয় কবি জীবন ও যৌবনের কোন এক রোমান্টিক মুহূর্তে তাঁর ভালোবাসার মানুষটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে খোঁপায় তারার ফুল দিতে চেয়ে ছিলেন। ফুলের সৌন্দর্যে মানুষের চোখ ও মন ভরে যায়। তবে মৃত্যুর সঙ্গে লড়া সৌন্দর্যের প্রতীক ফুলটি কি মেয়েটির বেলায় প্রযোজ্য? তার চুল নেই, মাথা আছে। শখ আছে, সাধ্য মেটানোর সামর্থ নেই। বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা আছে, শরীরের সে শক্তি নেই। ভয়াবহ মরণব্যাধি অসুখটির নাম মাত্র চিকিৎসা আছে, বেঁচে থাকার গ্যারান্টি নেই। ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’- একথাটি ক্যান্সারের মতে ভয়াবহ রোগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এই রোগটিকে পরাজিত করা মানে দিবাস্বপ্ন।

মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রতিচ্ছবি বা ছায়া যেভাবে থাকে ঠিক সেভাবে সর্বদা ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে থাকে মৃত্যু নামক জীবনের শেষ পরিণতি। অনেক ভুবন জয়ী বিখ্যাত মানুষ রোগটির কাছে চিরতরে হেরে গেছেন আর নি¤œ, মধ্যবিত্ত পরিবার আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে ঋণের জালের আবদ্ধ হয়েছেন অথবা মানুষের কাছে লাজ-লজ্জা ভুলে গিয়ে বাধ্য ভিক্ষুকের মত দুই হাত পাততে হয়েছে। এত বিশাল ব্যয়বহুল রোগ কি অল্প টাকায় নির্মূল হয়? টাইটানিক জাহাজকে যদি চিকিৎসার ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের আর্থিক সামর্থ্য হল এক টুকরো কাগজের নৌকার মত। যদিও আমরা এই ক্যান্সার রোগটিকে জয় করার কথা বলি, মানুষকে সান্ত¦না দেই তবে নিজের বা পরিবারের সদস্যদের বেলায় মানতে রাজি নই। এ রোগের জয় সম্পর্কে লিখতে গেলে লিখতে হবে ক্যান্সার রোগীদের গুরু-টেরিফক্সের কথা। হিরো, সুপারহিরো টেরিফক্স।

হিরো শব্দটি একটি পশ্চিমা কনসেপ্ট। টেরিফক্স কানাডার ২২ বছরের এক টগবগে যুবক। এত অল্প বয়সে ভয়াবহ ক্যান্সারের আক্রমণে তার এক পা কেটে ফেলে দিতে হয়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি ভাবলেন, আরও অর্থ প্রয়োজন, তিনি ঘোষণা করলেন, এক পা দিয়েই কানাডার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দৌড়ে অর্থ সংগ্রহ করবেন। আটলান্টিক সমুদ্রে এক পা ডুবিয়ে দিয়ে তিনি দৌড় শুরু করলেন। ততোদিন একটি নকল পা লাগানো হয়েছে। ১৪৩ দিনে ৩৩৩১ মাইল অতিক্রম করে তাকে হারতে হল। কারণ ততোদিনে ক্যান্সার ফুসফুস পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তার মৃত্যু হল। তিনি সংগ্রহ করলেন ১০০ মিলিয়ন ডলার। এখন সংগহ ৫০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে ২০১৩ সালে। তাঁকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তাঁর নামে ২৫তম টেরিফক্স ম্যারাথনে পৃথিবীর ৩ মিলিয়ন মানুষ অংশগ্রহণ করিেছল। এভাবেই তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। এদেশের সবচেয়ে শক্তিমান কলম জাদুকর হুমায়ুন আহমেদ স্যার ও চিরতরে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

যদিও তিনি আমেরিকায় চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তবে এ ব্যাপারে তাঁর পরিকল্পনার কথা পাঠকের উদ্দেশ্য লিখে গেছেন, “আমার পরিকল্পনা হল তিনজন ভিক্ষুকের কাছ থেকে প্রথমে ক্যান্সার রিসার্স সেন্টারের জন্য অর্থ ভিক্ষা নেওয়া হবে। এদের ছবি তুলবেন নাসের আলী মামুন। স্কেচ করবেন ও ইন্টারভিউ নিবেন মাসুদ হেলাল। তারপর আমরা যাব বাংলাদেশের তিন শীর্ষ ধনী মানুষের কাছে। ভিক্ষুকেরা দান করেছে শুনে তারা লজ্জায় পড়ে কি করেন, আমার দেখার ইচ্ছা। শীর্ষ ধনী, তারপর আমরা যাব তিন রাজনীতিবিদের কাছে। তারা কিছুই দেবেন না আমরা জানি, তারা নিতে জানেন, দিতে জানেন না। তবে খালি হাতে আমাদের ফেরাবেন না। উপদেশ দিবেন, আমাদের উপদেশের তো প্রয়োজন আছে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত, স্বর্ণ, মর্ত ও পাতাল ট্রিনিটি তিন মানে আমি, তুমি ও সে।” এখানে স্যার ‘আমরা’ (আমি, তুমি ও সে) বলতে সম্মিলিত শক্তিকে বুছিয়েছেন। তিনি অর্থ সংগ্রহের জন্য পথ দেখিয়েছেন। সরকার এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের পক্ষেই তার স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব।

বর্তমানে এই মরণ ব্যাধি এদেশে প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) সুপারিশ অনুযায়ী প্রতি ১৫ লক্ষ লোকের জন্য একটি করে রেডিও থেরাপি ইউনিট থাকা আবশ্যক। সে অনুযায়ী দেশে ১৪০-১৬০ রেডিও থেরাপি থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি (১০+৭) মোট ১৭টি ইউনিট রয়েছে। ৯০০ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরিবর্তে মাত্র ১৭৫ জন এবং ৩০০ চিকিৎসা পদার্থবিদ এর পরিবর্তে মাত্র ২০জন আছেন। যা একেবারেই অপ্রতুল। ক্যান্সার নিরাময়ে তিন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত। শল্য সার্জারি (ঝঁৎমবৎু), কেমোথেরাপি (ঈযবসড়ঃযবৎধঢ়ু) এবং বিকিরণ (জধফরড়ঃযবৎধঢ়ু) । ক্যান্সারের কোষ ঔষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে ধ্বংস করার পদ্ধতির নাম কেমো। রোগের ঝঃধমব অনুযায়ী ৬-১২ বার কেমো দেওয়া হয়। তখন রোগীর শরীরের চুল উঠে যায়, ক্ষুধামন্দা, বমিও বমির ভাব, শারীরিক দুর্বলতা, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি হয়। দেহের কোন অংশের অনিয়ন্ত্রিত কিংবা অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় টিউমার (ঞঁসড়ৎ) বলে।

টিউমার দুই ধরনের। এক-নির্দোষ টিউমার (ইবৎরমহ), অন্যটি ক্ষকিতর টিউমার (গধষরমবহঃ)। এটি ক্যান্সার বা কর্কট রোগ। তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগ অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে গেছে আমার মনে হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখনো সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা এ রোগ মোকাবেলা করে মানবজাতিকে কিভাবে দীর্ঘজীবী করা যায় তার জন্য প্রাণপনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন্ এই রোগ কি কারণে হয় তার সুনির্দিষ্ট কোন কারণ নেই। যে কোন মানুষের যে কোন বয়সে এ রোগ হতে পারে। তবে চর্বিযুক্ত খাবার, তামাকের বহুবিধ ব্যবহার, বংশগত কারণ, অনিয়ন্ত্রিত যৌন জীবন পরিত্যাগ করা ভাল। ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত বুঝতেই পারে না যে, তার এ রোগ শরীরে বাধা বেঁধেছে। তবে কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। মলত্যাগের অভ্যাস পরিবর্তন, কোন ক্ষথ সহজে না সাড়ানো, অস্বাভাবিক রক্ত ক্ষরণ, হজমে সমস্যা, কণ্ঠস্বর ভেঙ্গে যাওয়া এবং শরীরে তিল বা আচিলের সুষ্পষ্ট, পরিবর্তন ইত্যাদি। এগুলোর একটি দৃষ্টিগোচর হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ শনাক্ত করা গেলে নিরাময়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। ছোটবেলা থেকেই এ রোগটির কথা শুনেছি, দূর থেকে জেনেছি। কিন্তু নিকট আত্মীয়-স্বজন বা রক্তের সম্পর্কিতদের মধ্যে কাউকে দেখিনি। তাই রোগটি সম্পর্কে ততো বেশি মাথা ব্যাথা ছিলনা। কিন্তু ২০১৫ সালের শেষের দিকে আমার বড় বোন ফিরোজা বানু (৪৬) হঠাৎ বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। যিনি দিনাজপুর শহরে একটি প্রাইভেট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। পূর্ব থেকেই তার ডায়াবেটিস (১৫-২০) এবং উচ্চ রক্তচাপ (১১০-১৫০) ছিল। নিয়ম এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষুধ সেবন করতেন। পারিবারিক কাজের চাপের দরুন দিনে বা রাতে পরিপূর্ণ বিশ্রামের সময় পেতেন না। কোমর এবং বুকের ব্যাথা অনুভব করলে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করানো হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ফুসফুসে জমে থাকা পানি বের করা হয়। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা সমস্যা হলে তাঁকে ঢাকায় স্থানান্তরিত করা হয়। চোখে, পায়ে, কানের সহ নানাবিধ সমস্যা একসঙ্গে দেখা দেয়। ২০১৬ সালে জানুয়ারী মাসে মহাখালীর আয়শা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি হলে আমরা ছোট দুই ভাই তাঁকে দেখতে যাই।

তখন আপা (আমার স্ত্রীর বড় বোন) আমাদের মুখের দিকে না তাকিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আমাদের গলার কণ্ঠ স্বর শুনে থেমে থেমে কথা বলা শুরু করেন। সচেতন হওয়ায় তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। কিছু লোক আছেন যারা ধ্বংসের মধ্যেও সৃষ্টি করতে জানেন, এমতাবস্থায় আমাদের সান্ত¦না দিয়ে বলেন, “আমি হয়তো বেশি দিন বাঁচবো না, তবে মাত্র দুই বছর বাঁচার বড় ইচ্ছা ছিল। সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আমার যা হয়েছে হোক, তোমাদের যেন না হয়, তোমরা সবাই ভাল থেকো এবং আমার জন্য দোয়া করিও।” ডাক্তারের কাছে তাঁর চোখের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি উত্তরে বলেন, তাঁর চোখে রেটিনার সমস্যা হয়েছে, ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যেতে পারে।” ডাক্তারদের সন্দেহ হলে তারা ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য উরমহড়ংরং করলে রিপোর্ট আসে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় উঁপঃধষ ঈঁৎপরহড়সর রহ ঝরঃঁ (উঈওঝধ৪ যা শরীরের বিভিন্ন অংশে দ্রুত ছড়ায়। শুরু হল কেমো দেওয়া তখন শরীরের মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা গেলো।

চুলগুলো খসে গেলো, আঙ্গুলের নখগুলো কালো হয় গেলো, শরীরের শিরা-উপশিরাগুলো নিস্তেজ হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে না ফেরার দেশে এগিয়ে যেতে লাগলেন। একটু জ্ঞান ফিরলে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী বিমানে করে দিনাজপুরে নিয়ে এসে তিন দিন পর পুনরায় চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। কেমোথেরাপির কোর্স সমাপ্ত করে সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে দিনাজপুরে নিয়ে আসা হল। ২৩শে সেপ্টেম্বর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখা হল। ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০১৬ সকাল ৯ টায় পৃথিবীর সোনালী উদয়, মায়া, মমতা, ভালোবাসা ত্যাগ করে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। আহ্! মনে পড়ে, যে হাত দিয়ে তিনি আমাদেরকে পরম মমতায় আগলে রাখতেন সে হাত আজ পড়ে আছে নরম বিছানায় । যে চোখ দিয়ে তিনি পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্যকে উপভোগ করতেন এবং প্রিয় মানুষগুলোর মুখগুলো দেখে শান্তি পেতেন সে চোখ আর খুলল না।

যে পা দিয়ে কর্মঞ্চল হয়ে স্কুলের পথে রওয়ানা হতেন এবং যে পায়ের ভরে দাড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন, সে পা আজ সমান্তরালে পড়ে আছে। সন্তান জন্মের পর প্রথম বুলি মা। আজ মা তার আদরের মেয়েকে ‘মা, মা’ বলে ডাকছে। কিন্তু নিথর দেহে চিরবিশ্রামে শায়িত মেয়ে আজ তার মাকে প্রথম বুলি ‘মা’ বলে ডাকতে পারছে না। সে মুখ আজ চিরতরে স্তব্ধ। সযতেœ বেড়ে উঠা যে চুলগুলো খোঁপায় বেঁধে রেখে তিনি হয়তোবা ফুল গুঁজিয়ে দিতেন সে চুল আজ আর নেই। সংসারের জন্য অসীম ত্যাগ এবং সীমাহীন কষ্ট বা যন্ত্রনা নিয়ে আপার মত এই রোগে যাঁদের জীবন প্রদীপ অস্তমিত হয়, তাঁদের সকলকে যেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মাফ করে দেন। এ প্রার্থনা করি।##

Categories: টপ নিউজ,প্রধান নিউজ,মতামত বিশ্লেষণ,রংপুর,সম্পাদকীয়,সারা দেশ