জনপ্রিয় কবি ও সাহিত্যিক বিদ্যুৎ ভৌমিকের গল্প, অসুখ-বিসুখ

এমডি আবু জাফর, বিশেষ প্রতিনিধিঃঃ জানলাটা এমনিতে খোলাই থাকে ! সকাল-দুপুর-রাত্রি’ হাট করে খোলাই থাকে ! রাস্তার ধারে বাড়ি , এমনিতেই সারাদিন এ পথ ধরে সেই সূর্য ওঠা থেকে সূর্য ডোবা পর্যন্ত পথচারীর যাওয়া-আসা চলে এই রাস্তা দিয়ে ! সব সময়-ই গমগম করে এই পথ ! বাড়িটার নাম চন্দবিন্দু’ । এ বাড়ির গৃহকর্তা নিরঞ্জন মল্লিক তাঁর ভাইদের সাথে বনিবনার অমিলের জন্য সেই ত্রিশ বছর আগে পূর্ব পুরুষের সম্পত্তি ছেড়ে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এই নতুন পাড়া-তে এসে উঠেছেন ! কাজ করতেন শহর কলকাতার একটি বেসরকারি অফিসে ।

এখন প্রায় দশ-বারো বছর হয়েছে অবসর নিয়েছেন নিরঞ্জন বাবু । প্রথম প্রথম নিজের ভিটে ছেড়ে একেবারে নতুন জায়গায় , নতুন পরিবেশে এসে নিজেকে মানিয়ে নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল নিরঞ্জনের । এখন ব্যাপারটা সয়ে গেছে । স্ত্রী রমলা স্বামীর পাশে সব সময় ছায়া সঙ্গী হয়ে আছেন প্রায় চল্লিশটা বছর । এই চল্লিশটা বছর অনেক ঝড়-ঝাপটা এসেছে মল্লিক বাবুর জীবনে , সেসব সামলেছেন শ্রীমতী রমলা মল্লিক ! এক ছেলে , এক মেয়ে । ছেলেটা বড় , নাম কৌশিক । মেয়েটার নাম নবনীতা । নবনীতা-র বয়স সবে মাত্র বাইশ পেরিয়েছে । পড়ছে এই শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে । দেখতে-শুনতে বেশ দারুণ হয়েছে নবনীতা । কৌশিক , অনেক অল্প বয়সে পড়তে-পড়তে চাকরী পেয়ে যাবার কারণে বেশিদূর অর্থাৎ কলেজের গণ্ডি পেরতে পারেনি ।

নবনীতার থেকে কৌশিক প্রায় সাত-আট বছরের বড় । দাদা অন্ত প্রাণ নবনীতার । দাদা-ও একমাত্র বোনের সমস্ত সখ আবদার হাসিমুখে মিটিয়ে চলেছে ওর বোনের অল্প বয়েস থেকে । এ ভাবে হাসি-খুশিতে চলছিলো নিরঞ্জন বাবুর ও রমলা দেবীর সংসার । কিছুদিন থেকে নিরঞ্জন বাবু লক্ষ করছিলেন তার মেয়ে নবনীতার আচার-ব্যাবহার ঠিক ভালো থাকছে না ! সব সময় গুম মেরে বসে থাকে । কারোর সাথে বিশেষ কথা বলেনা নবনীতা । এই না কম কথা বলা’র সদুত্তর নিরঞ্জন বাবুর জানা নেই । বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পর ঘরে মেয়ে-টা একলা-একলা থাকে , কারোর সাথে নিজের থেকে যেচে কথাটুকু বলেনা ।

ওর বিশেষ প্রয়োজন হলে তবেই মুখফুটে কথা বলে নবনীতা ! তা না হলে ভীষণ চুপচাপ ! এক আকাশ নীরবতা নিয়ে ওর সারাক্ষণ নীরবযাপন ! বাবা হয়ে মেয়ের হঠাৎ করে এই পরিবর্তন , এটা মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না নিরঞ্জন বাবু ! রোজ যেমন ইউনিভারসিটি থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা কি আট্টা হয়ে যায় মেয়েটার বাড়ি ফিরতে , ইদানীং সাত তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে আসে নবনিতা ! এসেই নিজের ঘরে ঢুকে বেমালুম চুপচাপ ! অনেক চেষ্টা করেছে রমলা দেবী , কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নি । দাদা কৌশিক সেও চেষ্টা করেছে তার একমাত্র বোন-কে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আন্তে । পারেনি কেউ পারেনি ! এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে ওরা তিনজন ! মনের যে কি অবস্থা ওদের সেটা একমাত্র ঈশ্বরী জানেন ! মোবাইলের সুইচ-টা বন্ধ ছিল তখন ।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত , তার মধ্যে ১৭ থেকে ১৮ বার রিং করেও পাওয়া যায় নি নবনিতা-কে ! কি কারণ , এরকম তো হয় না ! ভেতরে-গভীরে অচেনা-অজানা একটা ভয় ও দুশ্চিন্তা বাড়ির সকলের মনকে আদ্যোপান্ত ঘিরে রেখেছিলো ! কি যে করে মেয়েটা , কে জানে ! এমন তো করেনা , ট্রেন লেট থাকলেও ফোন করে জানিয়ে দেয় যে বাড়ি ফিরতে আজ দেরি হবে । কিন্তু এমন টা হল কেন , তারমধ্যে মোবাইলটা কেন যে বন্ধ করে রেখেছে ! এসব ভাবলেই বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে ! কথা নেই , বার্তা নেই সুইচ অফ ! এটা বড্ডো বাড়াবাড়ি নবনিতার । দাদা কৌশিক রাত ৮ টার পর থেকে নবনিতার সমস্ত বন্ধুদের কাছে ফোন করেছে , কেউ বলতে পারেনি মেয়েটা কোথায় গেছে । বরং ওরা বলেছে , নবনিতা-তো অনেক আগেই উনিভারসিটি থেকে বেড়িয়ে গেছে ! তা হলে মেয়েটা কোথায় গেলো ? কোন বুদ্ধি মাথায় কাজ করছেনা ।

ওর বই-পত্র , টেবিলের ড্রয়ার তন্ন-তন্ন করে খুঁজে দেখেছে কিছুই খুঁজে ওরা পায়নি । রমলা দেবী-তো মেয়ের শোকে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন ! ঘনঘন আত্মীয়-পরিজনদের বাড়ি থেকে ফোন আসছে , নবনিতা কি বাড়ি ফিরেছে ? মনের মধ্যে খারাপ চিন্তা ঘুরছে ফিরছে । কি হোলো মেয়েটার ! কোথায় গেছে ! ও-কি বেঁচে আছে ? এইসব নানান প্রশ্ন নবনিতা’-র বাড়ির লোকের মধ্যে ঘূড়ছে-ফিরছে ! শঙ্কর এই পাড়ার-ই ছেলে । ছবি আঁকে । বাড়ি , নবনিতা’-দের পেছনের গলি । বাড়িতেই একটা ছোটোদের আঁকা শেখানোর স্কুল খুলেছে শঙ্কর । ওর বাবা দিলীপ বাবু এখানকার একটা প্রাইমারি স্কুলের টিচার ছিলেন , বছর দশেক হোলো তিনি হৃদয় রোগে মারা গেছেন ! শঙ্করের মা’-পূর্ণিমা দেবী স্বামীর পেনশন আর ছেলের আঁকা শেখানোর টাকায় কোনোরকমে সংসারটা চালাচ্ছেন । সেদিন রাতে শঙ্কর বাড়ি ছিলনা ! পূর্ণিমা দেবীও ছেলের বাড়ি না ফেরা নিয়ে চিন্তা করছিলেন ।

ফোন-ও করে ছিলেন এদিক-ওদিক ! কিন্তু শঙ্করের খবর পাওয়া যায়নি ! নবনিতার থেকে শঙ্কর বছর পাঁচেকের বড় । নবনিতা ওকে ক্লাস নাইন থেকে পছন্দ করতো । সেটা নিয়ে নবনিতা’-র বাড়িতে মাঝে মধ্যে চরম অশান্তি হোতো ! এমন কি শঙ্কর ও নবনিতা-কে নিয়ে প্রায় দিনই নিরঞ্জন বাবু , কৌশিক তাদের মেয়েকে শাসন করতেন । শাসন চরমে উঠলে মারধোর পর্যন্ত হোতো ওদের বাড়িতে ! কিন্তু এটা কি হোলো , শেষ পর্যন্ত নবনিতা শঙ্করের সাথে পালালো ! খবরটা দিয়েছিলো শঙ্করের বর্ধমানের পিসিমা । ওরা দুজন তারাপীঠে বিয়ে করে বর্ধমানে পিসিমার বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলো । নবনিতার বাবা নিরঞ্জন বাবু-তো তাঁর মেয়ের এরূপ মতিভ্রম দেখে পাগলের মতো অবস্থা ! আত্মীয়-পরিজনদের কাছে মুখ দেখাবেন কি করে ! ব্যাপারটা অনেক দূর , থানা ~ পুলিশ অব্দি গড়িয়ে ছিল । কিন্তু নবনিতা আর শঙ্কর-কে কেউ আলাদা করতে পারেনি । অবশেষে দুই বাড়ি এবং পাড়ার লোক জনদের সাক্ষী রেখে নিরঞ্জন বাবু ওদের চার হাত এক করলেন ! নবনিতা এখন সবার সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছে।##

Categories: আন্তর্জাতিক,টপ নিউজ,প্রধান নিউজ,বিনোদন,ভারত,শিল্প ও সাহিত্য