ঈদযাত্রা-১

সাঁইজীর বারামখানা…

লেখক-মো. মনিরুল ইসলাম

লালন বিশ্বাস করতেন ধর্ম বা সম্প্রদায়গত পরিচিতির চেয়ে মানুষের ‘মানুষ’ পরিচয়টাই বড়। জাত-পাত বা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির বিপরীতে তাঁর ছিল সহজিয়া অবস্থান। মানুষের কটু জিজ্ঞাসাকে আত্মজিজ্ঞাসায় পরিণত করে গানের সুরে লালন উচ্চারণ করেছেন-
“সব লোকে কয়
লালন কি জাত সংসারে।
লালন বলে জাতের কি রূপ
দেখলাম না তা-নজরে।”

বাংলার বাউল সাধনার পথিকৃত ছিলেন হচ্ছেন লালন সাঁই বা লালন ফকির। এ অঞ্চলে ছুফীবাদী দর্শনের কিংবদন্তী ছিলেন লালন। সাঁইজীর চিন্তার জমিনে চাষাবাদ হয়েছিল মানবতার দর্শনের, লালর নিজ বুকেই লালন করেছিলেন মানুষের সহজিয়া রূপ। তাঁর গানের সুরে নির্গত হয় ফকিরী সাধনার শ্বাস-প্রশ্বাস। সৃষ্টিকে ভালবাসার আহবান সহজ ভাষায় আর কে করেছেন! আশরাফ-আতরাফ, হিন্দু-মুসলিম, বেশ্যা-সাধু এসব পার্থক্য তিনি বাংলার কাঁদা-মাটিতে বিসর্জন দিতে চেয়েছেন। লালনের বেশ কিছু রচনাবলী থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তিনি ধর্ম-গোত্র-বর্ণ-সম্প্রদায় সম্পর্কে অতীব সংবেদনশীল ছিলেন। ব্রিটিশ আমলে যখন হিন্দু ও মুসলিম মধ্যে জাতিগত বিভেদ-সংঘাত বাড়ছিল তখন লালন ছিলেন এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। তিনি মানুষে-মানুষে কোনও ভেদাভেদে বিশ্বাস করতেন না। লালনের প্রতিটি গানে তিনি নিজেকে ফকির (আরবি ‘সাধু’) হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
গবেষকরা ধারণা করেন বিস্ময়কর প্রতিভার জন্ম হয়েছিল ঝিনাইদহ জেলার হারিশপুর গ্রামে অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে । কারো কারো মতে তিনি ১৭৭২ বা ১৭৭৪ সালে তার জন্ম হয়। তবে তার জন্ম এবং বংশপরিচয় দুটোই এক রহস্যের অন্তরালে লুকিয়ে আছে। লালন নিজেও এই রহস্যের কোনো সমাধান দিয়ে যাননি। তার নিজেরই কিছু গান ব্যাপারটিকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে। যেমন একটি গানে তিনি তার আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন-
‘সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন?
লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান।’
লালন ফকিরের জীবন সম্পর্কে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না। তাঁর সবচেয়ে অবিকৃত তথ্যসুত্র তার নিজের রচিত অসংখ্য গান। লালনের কোন গানে তার জীবন সম্পর্কে কোন তথ্য দেয়া নেই বলে জানা যায়।
তিনি একাধারে ফকির (বাঙালী মুসলমান সাধক), দার্শনিক, অসংখ্য অসাধারণ গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। ১৮৯০ সালের ১৭ই অক্টোবর লালন ১১৬ বা ১১৮ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে নিজ আখড়ায় মৃত্যুবরণ করেন। আজও সারা দেশ থেকে বাউলেরা অক্টোবর মাসে ছেউড়িয়ায় মিলিত হয়ে লালন শাহের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
এই স্বশিক্ষিত মানুষটির সহজিয়া দর্শন আজ পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। অসংখ্য পিএইচডি গবেষণা হয়েছে তাঁকে আর তাঁর দর্শন নিয়ে। লালন নিজে কখনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ না করলেও তাঁর চিন্তা-চেতনা আজ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বড় উপকরণ হয়ে উঠেছে। লালন সঙ্গীত নিজস্ব একটি ধারা সৃষ্টি করেছে, যে ধারায় বিশ্ব সংস্কৃতি প্রভাবিত হচ্ছে। ছেউড়িয়াতে যে আখড়া গড়ে উঠেছিল গত শতাব্দিতে, এই শতাব্দিতে সে আখড়ার অনুরণন বিশ্বময়।
সাঁইজীর বারামখানাকে ভাবের নজরে দেখলে স্নিগ্ধ ও পবিত্রতার পরশ পাওয়া এক তীর্থভূমি ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। অসংখ্য ফুলের গাছ আপন সৌন্দর্যে পুরো চত্ত্বরের স্নিগ্ধতাকে আরও মায়াময় করে তুলেছে। ধবধবে সাদা গম্বুজে ঢাকা সাঁইজীর সমাধিতে তাঁর পাশেই শায়িত আছেন পালক মা মতিজান ফকিরাণী। আশপাশে লালনের অসংখ্য অনুসারী ফকির সারবদ্ধ হয়ে শায়িত আছেন। সমাধির এক পাশে রয়েছে ফকির-সাধকদের বিশ্রামস্থল ও অডিটোরিয়াম, যেখানে প্রায় সর্বক্ষণই একতারা হাতে লালনচর্চা চলে। আরেকপাশে রয়েছে লালন একাডেমি যেখানে রঙিনভাবে ফুেট আছে লালনের স্মৃতি- রয়েছে সংগ্রহশালা। এই একাডেমিই লালন গবেষণায় সহায়তা, পরীবেক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করে।
অস্থিরতার এই জগতে আত্মারও কিছু খোরাক লাগে। সময়ে কুলালে আপনিও দর্শন করে আসুন লালনের দর্শন। ভাবাদর্শে কুলালে আপনিও লালন করুন ‘মানবতার লালন।’ মানুষকে ভালবাসুন, লালনের একতারায় আপনিও গলা সাধুন-
‘মানুষ ছেড়ে ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।’

মো. মনিরুল ইসলাম
লেখক ও প্রাবন্ধিক
গবেষক, খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা ইন্সটিটিউট