কুড়িগ্রামে অস্তিত্ব সঙ্কটে মাধ্যমিক বিদ্যালয়

শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছে না এলাকাবাসী

OLYMPUS DIGITAL CAMERA

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : কুড়িগ্রামে মাধ্যমিক বিদ্যালয় অনুমোদনের নামে উৎকোচ, রমরমা নিয়োগ বাণিজ্য ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যেনতেন বিদ্যালয় ঘর দাঁড় করিয়ে এমপিওভূক্তির পেছনে ছুটছে একটি কুচক্রি মহল। এতে গা ভাসিয়েছেন জেলা শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্ট অসাধু কিছু কর্মকর্তা। এ নিয়ে দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছে না সচেতন এলাকাবাসী। দুর্নীতি এবং অনিয়ম ঠেকাতে এলাকাবাসী বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিতে গিয়েও হচ্ছে হয়রানির শিকার। যেন দেখার কেউ নেই।
কুড়িগ্রাম জেলায় নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৮৪টি এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২৫২টি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে নেয়া হয় না ক্লাস। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বন্ধ রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলি। অথচ নিয়মিত দেখানো হয় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। খাতায়-কলমে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী দেখানো হলেও বাস্তবে এর চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রধানদের সাথে আতাঁত করে ওইসমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নাম এসব নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের খাতায় নাম ইস্যু করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ দেখানো হয়।
সরেজমিনে কুড়িগ্রাম জেলার বেশকিছু বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায় নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক এসব বিদ্যালয়গুলির করুণ অবস্থা।
১৫ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে ১২টায় গিয়ে দেখা যায় সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের চৈতার খামার গ্রামেই গড়ে উঠেছে এক’শ গজের মধ্যে পূর্ব কুমরপর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় এবং চৈতার খামার নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দুপুর ঘনিয়ে আসলেও বিদ্যালয় দু’টির একটিও খোলা হয়নি। অথচ জাতীয় পতাকা উড়ছে।
বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার শাহ্ জামাল জানান, পূর্ব কুমরপর আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চাকুরি করেন একই ইউনিয়নের ভোগডাঙ্গা একে দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে। অথচ খাতায় কলমে তিনি এই স্কুলেও প্রধান শিক্ষক। কোনোদিনও তাকে স্কুলে দেখি নাই। এই স্কুলে সকালে পিয়ন এসেই পতাকা তুলে দিয়ে যান। বিকাল হলেই পতাকা নামিয়ে ফেলেন। এটিই তার চাকুরি। স্কুলটি ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ছাত্র-ছাত্রীও আসেনি একদিনও ক্লাস হয়নি।
এলাকার মোজাম্মেল হক জানান-চৈতার খামার নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি মাঝে মধ্যে খোলা দেখা যায়। এলাকায় স্কুল থাকলেও আমাদের ছেলেমেয়েরা দূরের স্কুলে পড়ে। এলাকায় স্কুল থেকে লাভ কি? এমন স্কুল থাকার চেয়ে না থাকায় ভাল। তিনি আরো জানান, এসব স্কুল প্রতিষ্ঠায় কোনো নিয়ম মানা হয়নি। শিক্ষা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা টাকার বিনিময়ে এসব স্কুল অনুমোদন দিয়েছে। আমি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাই নাই। দুর্নীতি প্রতিরোধ তো দূরের কথা বরং আমার কাছ থেকেই দুর্নীতি প্রতিরোধের নামে উৎকোচ দাবি করা হয়েছে। যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
চৈতার খামার নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ বেলাল উদ্দিনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন-আমি চকুরি করি অন্য স্কুলে। এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে আমার কাগজপত্র দেখিয়ে বিদ্যালয় অনুমোদন পায়। সেই থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমার নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া জেলা শিক্ষা অফিসার স্যার বলেছেন স্কুলটি টিকে রাখতে যা করা দরকার তা করো-কি আছে আমি দেখবো।
পূর্ব কুমরপর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিয়াজুল ইসলাম এলাকায় সাংবাদিকদের আগমনের কথা শুনে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে রাখেন। একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ওই বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষক আমজাদ হোসেন বলেন-অনেক টাকা পয়সা নষ্ট করেছি এই বিদ্যালয়ের পেছনে। প্রধান শিক্ষক অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন। তিনি স্কুলে না আসায় স্কুলটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
একই অবস্থা বিরাজ করছে জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার চর বেরুবাড়ি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, গোবিন্দপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ফুলবাড়ি উপজেলার চর বড়লই নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ভবেশ আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভুয়া নাম দেখিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি কৌশলে হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে কথা হলে কুড়িগ্রাম জেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা অফিসার মোঃ আব্দুল কাদের কাজী জানান, ১’শ গজের মধ্যে কিভাবে দু’টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পায় তা আমার জানা নাই। তবে এতটুকু বলবো স্কুল দু’টি অবৈধ এবং নিয়মপরিপন্থীভাবেই হয়েছে। আমি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রতিবেদন দিয়েছি। আশা করছি দ্রুত একটা পদক্ষেপ আসবে।

Categories: প্রধান নিউজ,রংপুর,শিক্ষা বাতায়ন

Tags: