দেবিদ্বারে নিজ শাশুরিকে হত্যা করেছে ঘরজামাই

দেবিদ্বারে নিজ শাশুরিকে হত্যা করেছে ঘরজামাই

মোঃ আমির হোসেন আমু, দেবিদ্বার :   কুমিল্লা দেবিদ্বারে ধামতি গ্রামে নিজ শ্বাশুড়ীকে বালিশ চাপা দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে ঘরজামাই। হত্যাকান্ডের ১২ ঘন্টার মধ্যে মূল রহস্য উদঘাটন ও ঘাতক ঘরজামাইকে আটক করতে সক্ষম হয় দেবিদ্বার থানার পুলিশ।

স্থানীয়রা জানায়, মাটির ভিটির টিনের ঘরে সিঁধ কেটে ঢুকে নিজ শ্বাশুড়ীকে বালিশ চাপা দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে ঘরজামাই। হতভাগ্য শ্বাশুড়ীর নাম ফরিদা বেগম(৬২)। তিনি দেবিদ্বার উপজেলার ধামতি পূর্বপাড়া খোশকান্দি গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের স্ত্রী।
আর ঘাতক পাষন্ড ঘরজামাই মনির হোসেন (৩৫)। সে ভিকটিমের সৎ মেয়ে আয়েশার স্বামী।
ফরিদা বেগমের বসত ঘরের পাশেই ঘরজামাই মনির শ্বশুরের দেয়া জায়গায় আলাদা একটি ঘর তুলে স্ত্রী সন্তানসহ বসবাস করত। কখনো রাজমিস্ত্রীর কাজ আর কখনো অটো চালিয়ে সংসার চালাত সে। তার মূলবাড়ী একই উপজেলা জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের খয়রাবাদ গ্রামে হলেও বর্তমানে ওখানে তাদের কোন সহায় সম্পত্তি নাই। শুশুরের ঠিকানাতেই থাকত সে।

দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাজী মোঃ মিজানুর রহমান জানান,
গতকাল ৯ অক্টোবর’ সকালে গ্রামে বয়স্ক এক মহিলার লাশ তার টিনশেডের বসত ঘরের বিছানায় পড়ে আছে এবং ঘরের জানালা বরাবর নীচে মাটির ভিটিতে সিঁধ কাটা দেখে মর্মে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে দেবিদ্বার থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মৃতদেহের সুরতহাল তৈরী করে লাশ ময়না তদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
এ সময় ভিকটিমের আত্মীয় স্বজনরা দীর্ঘ ৫/৬ বছর ধরে শ্বাসকষ্টে ভোগা ৬২ বছর বয়সী ফরিদার মৃতদেহের ময়না তদন্ত করতে দিতে রাজী হচ্ছিলনা তার পরিবার। তাদের প্রাথমিক ধারনা ছিল ঘরে চোর ঢুকেছিল আর চোর দেখেই হয়ত শ্বাসকষ্ট উঠে মারা গেছে ফরিদা।
সুরতহাল তৈরীর সময় ভিকটিমের শরীরের কোথাও কোন দাগ বা জখম দেখা না গেলেও ঘরে সিঁধ কাটা দেখে এবং ভিকটিমের মোবাইল ফোনটি খুঁজে না পেয়ে মৃত্যুটি স্বাভাবিক নয় বলে নিশ্চিত হই। সিঁদ কাটা জায়গা দিয়ে একজন চিকন মানুষেরও ঢোকা বা বের হওয়া সম্ভব নয় দেখে আমরা ভিকটিমের পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে থাকি একপর্যায়ে জানা যায় সৎ মেয়ে আয়েশার জামাই মনিরের স্বভাব ভালো নয়। সে শ্বাশুড়ীকে সহ্য করতে পারতনা।
সে প্রায়ই ঝগড়া ও মানষিক অত্যাচার করত শ্বাশুড়ীকে। যথারীতি মনিরকে থানা হেফাজতে নেয়া হয়। সে খুব সরলভাবে ইন্টারোগেশনের জবাব দেয়ায় প্রথমে কিছুটা কনফিউজ হই। কিন্তু হিসাব মেলানো যাচ্ছিলনা। দেবিদ্বার থানার এসআই প্রেমধন ও মোর্শেদের সমন্বয়ে গঠিত টিম নিয়ে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ কন্টিনিউ করতে থাকি। অনেক চেষ্টার পর একপর্যায়ে মুখ খোলে মনির। এরপর অকপটেই সব বলে ফেলে। একটু চালাকিরও আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করে।
তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে আর ঘর জামাই বলে প্রায়ই খোটা দেয়া হত বলে ভেতরে ভেতরে শ্বাশুড়ীর প্রতি তার মন বিষিয়ে উঠেছিল।
সপ্তাহখানেক আগে পরিকল্পনা করে ৮ অক্টোবর দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে সে একাই সিঁধ কাটে। তারপর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে জানালা খুলে ঘরে ঢুকে বৈদ্যুতিক বাতি নিভিয়ে বুকের উপর উঠে বসে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে নিজ শ্বাশুড়ী ফরিদাকে। অতঃপর ঘরে কোথাও টাকা পয়সা আছে কিনা খুঁজে না পেয়ে শ্বাশুড়ীর মোবাইলটা নিয়ে পুকুরের পানিতে ফেলে দিয়ে কোদাল নিজ ঘরে রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসলে সেও অন্যদের সাথে স্বাভাবিকভাবে কান্নাকাটি করতে থাকে মৃত শ্বাশুড়ীর জন্য। কিন্তু তার স্বাভাবিক কান্নাকাটির আড়ালে কিছুটা অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাই। প্রাথমিক ভাবে তাকে কিছু প্রশ্ন করা হলে সে স্বাভাবিক জবাব দিলেও আমাদের সন্দেহ এড়ায়না। তাকে নিয়ে আসা হয় থানায়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে ২০ হাজার টাকা নিয়েও তাকে খারাপ ডোবা জায়গায় থাকতে দেয়া এবং সবসময় ঘরজামাই, খারাপ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করায় প্রতিশোধপরায়ন হয়ে শ্বাশুড়ীর ঘরটি দখলে নেয়ার উদ্দেশ্যে ঠান্ডা মাথায় বালিশ চাপা দিয়ে একাই শ্বাশুড়ী ফরিদাকে হত্যা করেছে মর্মে অকপটে স্বীকার করে পুলিশের কাছে। তার স্বীকারোক্তি অনুসারে পুলিশ আজ সকালে কোদাল ও বালিশ জব্দ করেছে। আজ তাকে আদালতে প্রেরণের কথা রয়েছে। এ ঘটনায় গতকালই ভিকটমের মেয়ে মরিয়মের দায়েরকৃত এজাহারের ভিত্তিতে দেবিদ্বার থানার মামলা নং-৫, তাং-৯/১০/১৮, ধারা: ৪৫৯/৩৮০/৩০২/৩৪ রুজু করা হয়েছে।

Categories: কুমিল্লা,টপ নিউজ

Tags: