ঢাকা ০৭:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪, ৫ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ ::
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম আইএমও এর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা’র আদর্শ বাস্তবায়ন তরুনদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে নড়াইল-১আসনে আবারো আ’লীগের মনোনয়ন পেলেন বিএম কবিরুল হক মুক্তি খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা ছিলেন বহুমাত্রিকগুনের অধিকারী : অধ্যাপক ড. এম শমসের আলী ফের নৌকার টিকিট পেলেন রাজী মোহাম্মদ ফখরুল পি‌রোজপু‌রে ফেজবু‌কে স্টাটার্স দি‌য়ে অনার্স পড়ুয়া ছা‌ত্রের আত্মহত্যা যেভাবে জানা যাবে এইচএসসির ফল > How to know HSC result নেত্রকোণা -২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ওমর ফারুক জনপ্রিয়তার শীর্ষে চাটখিলে যুবলীগের ৫১ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত দিনব্যাপী গণসংযোগ করলেন নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশী শাহ্ কুতুবউদ্দিন তালুকদার রুয়েল

সাতক্ষীরাতে চারশত বছরের পুরানো ঐতিহ্য সর্পদেবীর পূজা অনুষ্ঠিত

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৩০:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৯০ বার পড়া হয়েছে
দেশের সময়২৪ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

শংকর মন্ডল শিবা, সাতক্ষীরা প্রতিনিধিঃ আজ শনিবার হিন্দু শাস্ত্রানুযায়ী সর্প দেবী মা মনসা পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাতক্ষীরায়। শহরের পলাশপোলে প্রাচীন বটবৃক্ষতলে অনুষ্ঠিত এই পূজায় শত শত নারী ও পুরুষভক্ত দুধ কলা ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে মা মনসার পূজা দেন। এ সময় সর্প দেবীকে তুষ্ট করতে মনসার পালা গান অনুষ্ঠিত হয়।

কথিত আছে যে,

মোগল আমলে একজন রাজকর্মচারী আজকের পলাশপোলের মনসাতলায় (বটবৃক্ষতলে) বিশ্রাম নিতে গিয়ে তন্দ্রাছন্ন হয়ে পড়েন। দিনটি ছিল বাংলা সনের ৩১ ভাদ্র। হঠাৎ তিনি জেগে দেখেন, একেবারে কাছেই একটি সাপ ফণা তুলে তাকে ছায়া দিচ্ছে যাতে ঘুমাতে পারেন।

সেই থেকে তিনি ওই বটতলায় সাপের দেবী মনসার উদ্দেশ্যে পূজা শুরু করেন এবং অন্যদেরও মনসা পূজা করতে বলেন। এ পূজার প্রসাদ পুকুরে ফেলে দেয়ায় এর পানি মিষ্টি হয়ে যায়। এ কারণে ওই পুকুরের নাম হয়ে পড়ে গুড়পুকুর।

এছাড়াও অন্যরা বলেন, পুকুরে বেশি দিন পানি থাকত না। পরে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে স্থানীয়রা সেখানে ১০০ ভাড় গুড় ঢেলে দিলে পুকুরে পানি ওঠে, তাই এমন নামকরণ। আবার শোনা যায়, আশপাশের খেজুর গাছের রস থেকে গুড় তৈরির পর তা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থেই পুকুরটি খনন করা হয়েছিল।

আরেকটি মত হচ্ছে, গৌর বর্ণে ব্রাহ্মণরা পুকুরটির মালিক ছিলেন। এ থেকেই গৌরদের পুকুর। কালক্রমে বিবর্তনের ধারায় গুড়পুকুর। যা-ই হোক, পুকুরের নামেই মেলা হয়ে আসছে কয়েক শতাব্দী ধরে। সম্ভবত দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে হয়ে আসছে মনসা ও বিশ্বকর্মা পূজাও। এলাকার অনেকেই বলেন, ওই দুই পূজাকে ঘিরেই মূলত গুড়পুকুর মেলা। সাতক্ষীরার সবচে বড় লোকজ উৎসব এটি।

বন কেটে আবাদ হওয়া জনপদ সাতক্ষীরা। এখানে দেখা মেলে সর্পদষ্ট স্বামীকে নিয়ে জলপথে যাবার কালে বেহুলার যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কাজেই সর্পশঙ্কুল সাতক্ষীরায় দেবী মনসার ভজনা কত বেশি লোকজ ও ঐতিহ্যবাহী হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায় । মনসার পূজাটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হলেও মেলাটি কিন্তু সাতক্ষীরাবাসীর। এজন্যই ঈদ বা পূজা-পার্বণের মতো গুড়পুকুর মেলাও এখানে বিরাট এক উপলক্ষ।

এ সময় জামাইকে নিমন্ত্রণ করেন স্থানীয়রা। মেয়েকে আনেন এ সময়। বছরের অন্য পার্বণে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আসতে না পারলেও গুড়পুকুরের মেলার সময় মেয়েরা বাবার বাড়ি আসবেই। মূল আয়োজনটি একদিনের, ভাদ্র মাসের শেষ দিন। তবে গুড়পুকুরের মেলা চলে এক মাস অবধি। আবহমানকাল ধরে চলে আসা এ মেলায় পসরা সাজাতে একসময় ঢাকা, ফরিদপুর,রাজবাড়ি,বরিশাল ও কলকাতার পাশাপাশি বিলেতি ব্যবসায়ীরাও সমবেত হতেন বলে কেউ কেউ জানান। মেলা ঘিরে একসময় উৎসবের আমেজ বয়ে যেত সাতক্ষীরায়।

এ মেলা মূলত সনাতন ধর্মালম্বীদের দুটি পূজাকে কেন্দ্র করে হলেও সেটি এ জনপদের মানুষের কাছে অসাম্প্রদায়িতার সেতুবন্ধনে পরিণত হতো। তাছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলা।মেলায় কোটি কোটি টাকার কেনাবেচা হতো । বিশেষ করে কাঠের তৈরি আসবাবপত্র, বেত ও বাঁশের পণ্যের পাশাপাশি সাতক্ষীরার বিভিন্ন ফলদ, ঔষধি ও কাঠজাতীয় গাছের চারার চাহিদা ছিল উল্লেখযোগ্য।

মেলা শুরুর ১৫-২০ দিন আগে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা বড় বড় লঞ্চ-স্টিমার ও অন্যান্য যানবাহন বোঝাই করে তাদের মালপত্র নিয়ে আসতেন। পলাশপোলের মনসাতলা থেকে শুরু হলেও সাতক্ষীরা শহরের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় মেলা বসত। শহর ছেড়েও অনেক দূর থেকে শোনা যেত মেলার গমগম আওয়াজ।

মেলায় যাত্রা, সার্কাস, পুতুলনাচ, নাগরদোলা ও জাদু খেলার আয়োজন থাকত খুবই জমজমাট। তাছাড়া সারি সারি ভ্রাম্যমাণ মিষ্টির দোকানে বিক্রি হতো রসমন্ডি, পানতোয়া ও ছানা-সন্দেশ। মেলায় আগত দর্শনার্থীরা অন্যান্য কেনাকাটা শেষে মিষ্টি না কিনলে যেন তাদের কেনাকাটায় অপূর্ণতা রয়ে যেত।

কিন্তু কাল ক্রমে এই মেলার পরিধি কমে গেছে এখন সাতক্ষীরার শহরে অবস্থিত শহীদ রাজ্জাক পার্কে অনুষ্ঠিত হয় জেলাপ্রশাসনের আয়োজনে কিন্তু আগের মতো এতোটা আনন্দ বা জাঁকজমক হয় না। ২০০২ সালের ২৮ শে সেপ্টেম্বর রাতে রক্সি হলে ও পলাশপোল স্টেডিয়ামে সার্কাসে বোমা হামলা হয়, এ হামলায় শিশুসহ ৩ জন নিহত হয় আরও শত শত লোক আহত হয় সেই থেকে মেলায় নেমে আসে অন্ধকারচ্ছন্ন।

২০১০ সালে জেলা প্রশাসক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তিনি সাহসীকতার সাথে শহীদ রাজ্জাক পার্কে মেলার আয়োজন শুরু করছে আজও চলছে কিন্তু করোনার কারণে ২ বছর বন্ধ ছিলো। এবছর জেলা প্রশাসক হুমায়ুন কবির নিজে থেকে মনসা পূজা পরিচালনা ও মেলার উদ্বোধন করবেন। এবং এই অনুষ্ঠানে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয় সে দিকে সকলকে সজাগ থাকতে বলছেন।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

সাতক্ষীরাতে চারশত বছরের পুরানো ঐতিহ্য সর্পদেবীর পূজা অনুষ্ঠিত

আপডেট সময় : ০৩:৩০:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

শংকর মন্ডল শিবা, সাতক্ষীরা প্রতিনিধিঃ আজ শনিবার হিন্দু শাস্ত্রানুযায়ী সর্প দেবী মা মনসা পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাতক্ষীরায়। শহরের পলাশপোলে প্রাচীন বটবৃক্ষতলে অনুষ্ঠিত এই পূজায় শত শত নারী ও পুরুষভক্ত দুধ কলা ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে মা মনসার পূজা দেন। এ সময় সর্প দেবীকে তুষ্ট করতে মনসার পালা গান অনুষ্ঠিত হয়।

কথিত আছে যে,

মোগল আমলে একজন রাজকর্মচারী আজকের পলাশপোলের মনসাতলায় (বটবৃক্ষতলে) বিশ্রাম নিতে গিয়ে তন্দ্রাছন্ন হয়ে পড়েন। দিনটি ছিল বাংলা সনের ৩১ ভাদ্র। হঠাৎ তিনি জেগে দেখেন, একেবারে কাছেই একটি সাপ ফণা তুলে তাকে ছায়া দিচ্ছে যাতে ঘুমাতে পারেন।

সেই থেকে তিনি ওই বটতলায় সাপের দেবী মনসার উদ্দেশ্যে পূজা শুরু করেন এবং অন্যদেরও মনসা পূজা করতে বলেন। এ পূজার প্রসাদ পুকুরে ফেলে দেয়ায় এর পানি মিষ্টি হয়ে যায়। এ কারণে ওই পুকুরের নাম হয়ে পড়ে গুড়পুকুর।

এছাড়াও অন্যরা বলেন, পুকুরে বেশি দিন পানি থাকত না। পরে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে স্থানীয়রা সেখানে ১০০ ভাড় গুড় ঢেলে দিলে পুকুরে পানি ওঠে, তাই এমন নামকরণ। আবার শোনা যায়, আশপাশের খেজুর গাছের রস থেকে গুড় তৈরির পর তা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থেই পুকুরটি খনন করা হয়েছিল।

আরেকটি মত হচ্ছে, গৌর বর্ণে ব্রাহ্মণরা পুকুরটির মালিক ছিলেন। এ থেকেই গৌরদের পুকুর। কালক্রমে বিবর্তনের ধারায় গুড়পুকুর। যা-ই হোক, পুকুরের নামেই মেলা হয়ে আসছে কয়েক শতাব্দী ধরে। সম্ভবত দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে হয়ে আসছে মনসা ও বিশ্বকর্মা পূজাও। এলাকার অনেকেই বলেন, ওই দুই পূজাকে ঘিরেই মূলত গুড়পুকুর মেলা। সাতক্ষীরার সবচে বড় লোকজ উৎসব এটি।

বন কেটে আবাদ হওয়া জনপদ সাতক্ষীরা। এখানে দেখা মেলে সর্পদষ্ট স্বামীকে নিয়ে জলপথে যাবার কালে বেহুলার যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কাজেই সর্পশঙ্কুল সাতক্ষীরায় দেবী মনসার ভজনা কত বেশি লোকজ ও ঐতিহ্যবাহী হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায় । মনসার পূজাটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হলেও মেলাটি কিন্তু সাতক্ষীরাবাসীর। এজন্যই ঈদ বা পূজা-পার্বণের মতো গুড়পুকুর মেলাও এখানে বিরাট এক উপলক্ষ।

এ সময় জামাইকে নিমন্ত্রণ করেন স্থানীয়রা। মেয়েকে আনেন এ সময়। বছরের অন্য পার্বণে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আসতে না পারলেও গুড়পুকুরের মেলার সময় মেয়েরা বাবার বাড়ি আসবেই। মূল আয়োজনটি একদিনের, ভাদ্র মাসের শেষ দিন। তবে গুড়পুকুরের মেলা চলে এক মাস অবধি। আবহমানকাল ধরে চলে আসা এ মেলায় পসরা সাজাতে একসময় ঢাকা, ফরিদপুর,রাজবাড়ি,বরিশাল ও কলকাতার পাশাপাশি বিলেতি ব্যবসায়ীরাও সমবেত হতেন বলে কেউ কেউ জানান। মেলা ঘিরে একসময় উৎসবের আমেজ বয়ে যেত সাতক্ষীরায়।

এ মেলা মূলত সনাতন ধর্মালম্বীদের দুটি পূজাকে কেন্দ্র করে হলেও সেটি এ জনপদের মানুষের কাছে অসাম্প্রদায়িতার সেতুবন্ধনে পরিণত হতো। তাছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলা।মেলায় কোটি কোটি টাকার কেনাবেচা হতো । বিশেষ করে কাঠের তৈরি আসবাবপত্র, বেত ও বাঁশের পণ্যের পাশাপাশি সাতক্ষীরার বিভিন্ন ফলদ, ঔষধি ও কাঠজাতীয় গাছের চারার চাহিদা ছিল উল্লেখযোগ্য।

মেলা শুরুর ১৫-২০ দিন আগে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা বড় বড় লঞ্চ-স্টিমার ও অন্যান্য যানবাহন বোঝাই করে তাদের মালপত্র নিয়ে আসতেন। পলাশপোলের মনসাতলা থেকে শুরু হলেও সাতক্ষীরা শহরের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় মেলা বসত। শহর ছেড়েও অনেক দূর থেকে শোনা যেত মেলার গমগম আওয়াজ।

মেলায় যাত্রা, সার্কাস, পুতুলনাচ, নাগরদোলা ও জাদু খেলার আয়োজন থাকত খুবই জমজমাট। তাছাড়া সারি সারি ভ্রাম্যমাণ মিষ্টির দোকানে বিক্রি হতো রসমন্ডি, পানতোয়া ও ছানা-সন্দেশ। মেলায় আগত দর্শনার্থীরা অন্যান্য কেনাকাটা শেষে মিষ্টি না কিনলে যেন তাদের কেনাকাটায় অপূর্ণতা রয়ে যেত।

কিন্তু কাল ক্রমে এই মেলার পরিধি কমে গেছে এখন সাতক্ষীরার শহরে অবস্থিত শহীদ রাজ্জাক পার্কে অনুষ্ঠিত হয় জেলাপ্রশাসনের আয়োজনে কিন্তু আগের মতো এতোটা আনন্দ বা জাঁকজমক হয় না। ২০০২ সালের ২৮ শে সেপ্টেম্বর রাতে রক্সি হলে ও পলাশপোল স্টেডিয়ামে সার্কাসে বোমা হামলা হয়, এ হামলায় শিশুসহ ৩ জন নিহত হয় আরও শত শত লোক আহত হয় সেই থেকে মেলায় নেমে আসে অন্ধকারচ্ছন্ন।

২০১০ সালে জেলা প্রশাসক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তিনি সাহসীকতার সাথে শহীদ রাজ্জাক পার্কে মেলার আয়োজন শুরু করছে আজও চলছে কিন্তু করোনার কারণে ২ বছর বন্ধ ছিলো। এবছর জেলা প্রশাসক হুমায়ুন কবির নিজে থেকে মনসা পূজা পরিচালনা ও মেলার উদ্বোধন করবেন। এবং এই অনুষ্ঠানে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয় সে দিকে সকলকে সজাগ থাকতে বলছেন।